কণ্ঠ ডেস্ক
হকির যে কোনও আসরে প্রথমবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। জুনিয়র এশিয়া কাপে থাইল্যান্ডকে ৭-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে লাল-সবুজ দল। অথচ এই দলটি সামান্য পারিশ্রমিক পেয়ে ওমানের মাস্কটে সর্বস্ব দিয়ে বিশ্বকাপ নিশ্চিত করেছে। রকি-জয়দের এই পর্যন্ত আনার পেছনে কোচ মওদুদুর রহমান শুভর অবদান কম নয়। শুরুতে কোচ নিয়ে বিতর্ক ছিল। তারপর নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়ার রহস্য জানাতে সাবেক স্ট্রাইকার মাস্কট থেকে ফোনে মুখোমুখি হয়েছিলেন প্রতিদিনের কণ্ঠের।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: অভিনন্দন আপনিসহ পুরো দলকে।
শুভ: ধন্যবাদ। আসলে এই সাফল্য শুধু আমাদের দলেরই নয়, দেশবাসীরও। সবাই সহযোগিতা করেছেন বলে প্রথমবার বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলবে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: নিশ্চয়ই সবাই আনন্দে ভাসছেন। মাঠে তো সবাইকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে। হকির যে কোনও আসরে এটা তো বড় সাফল্য…
শুভ: তা তো অবশ্যই। মাঠে খেলা শেষে সবাই জাতীয় পতাকা নিয়ে উৎসব করেছে। মুহূর্তগুলো ক্যামেরাবন্দী করেছে। আসলে এই আনন্দ বলে বোঝানো যাবে না। বিশ্বকাপ অনেক বড় বিষয়। আমরা স্বপ্ন দেখে আসছিলাম। ছেলেরা তা করে দেখিয়েছে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: এমন সাফল্যের রহস্য কী?
শুভ: রহস্য আর কিছুই না। খেলোয়াড়দের ডেডিকেশন ছিল অন্য পর্যায়ে। তাদের সামনে লক্ষ্য দেওয়া ছিল যে করেই হোক বিশ্বকাপে যেতে হবে। ভালো করতে হবে। আদতে সেটাই হয়েছে। এছাড়া ফেডারেশন সভাপতি ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং বিকেএসপির মহাপরিচালকসহ সবার সহযোগিতা ছিল বলতে হবে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: বিশ্বকাপে জায়গা পাওয়ার জন্য কখন আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর ছিলে দল?
শুভ: দেখুন আমরা তো ঢাকাতে কোনও অনুশীলন ম্যাচ খেলিনি। মাস্কটে এসে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে ২-১ গোলে হারি। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ ভালো খেলেছে। ঠিক তখনই সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বেশি জাগে। এবার টুর্নামেন্টে ভালো কিছু করা সম্ভব হবে। আসলে মাঠের পারফরম্যান্সে সেটাই হয়েছে। এছাড়া অনুশীলনের শুরু থেকে লক্ষ্য ছিল একটাই- বিশ্বকাপে খেলতে হবে। ছেলেরাও সেভাবে তৈরি হয়েছে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: টুর্নামেন্টে শুরুতে ওমানকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। মাঝে শক্তিশালী মালয়েশিয়া ও চীনের সঙ্গে জিততে জিততে ড্র করেছে। আবার পাকিস্তানের কাছে ৭ গোলও হজম করেছে। কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
শুভ: পাকিস্তানকে আমরা প্রথম কোয়ার্টারে রুখে দিয়েছিলাম। এরপর নিজেদের ভুলের কারণে একের পর এক গোল হজম করতে হয়েছে। এছাড়া অন্য ম্যাচগুলোতে আমরা ভালো খেলেছিলাম। টুর্নামেন্টে অনেক সময় বাজে একদিন যায়। আমাদেরও তাই হয়েছে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: শুনেছি, এই দলের খেলোয়াড়রা আবাসিক অনুশীলনে দিনপ্রতি ৪০০ ও মাস্কটে এক হাজার টাকা ছাড়া আর কিছু পায়নি।
শুভ: এটা ফেডারেশন ভালো বলতে পারবে। তবে আমি মনে করি খেলোয়াড়দের সুযোগ সুবিধা আরও বাড়াতে হবে। মাস্কটে এসে যদি বাসা থেকে টাকা নিয়ে এসে ভালো বুট ও স্টিক কিনতে হয় তাহলে কী বলবেন। ভালো বুটের দামই তো দেড়শ ডলারের ওপরে। তাহলে বুঝে নিন। আমি তো শুনেছি ওরা বাসা থেকে টাকা এনে বুট কিনেছে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: অনুশীলন শুরুর আগে আপনাকে কোচ করা নিয়ে তো অনেকে সমালোচনা করেছিল। তারওপর দলের সঙ্গে ফিজিও ছাড়া অন্য কোনও কোচিং স্টাফও নেই।
শুভ: নতুন করে আমার কিছু বলার নেই। ফেডারেশন আমার ওপর আস্থা রেখেছিল। তা পালন করার চেষ্টা করেছি। অন্য দলে একাধিক কোচিং স্টাফ থাকলে আমাকে বলতে গেলে একাই কাজ করতে হয়েছে। কোচ নিয়োগ নিয়ে কিছূ বলতে চাই না। যারা বলেছে তারা এখন ভালো বলতে পারবে। নিয়োগ ঠিক ছিল কিনা। যারা বলেছে তারাও ভালোমানের কোচ।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: হকিতে তিন বছরে একবার লিগ হয়। খেলে তো তেমন টাকা-পয়সাও পাওয়া যায় না। তাহলে হকিতে সাফল্য কীভাবে আসছে?
শুভ: আসলে হকিতে যারা আসে তাদের একপর্যায়ে খেলার প্রতি ভালোবাসা জন্মে যায়। এখন তো ধরেন হকি খেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যায়। বাহিনীগুলোকে চাকরির সুযোগ থাকে। তাই আমার মনে হয় কিছু ছেলে-মেয়েরা আসছে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: হকি তো বিকেএসপি নির্ভর। আপনার দলের সবাই বিকেএসপিতে পড়াশোনা করছে কিংবা করেছে। অন্যভাবে খেলোয়াড় উঠে আসছে না কেন?
শুভ: আসবে কোথা থেকে। তৃণমূলে কিছু কোচ ও সংগঠক আছে তাদের মাধ্যমে বিকেএসপিতে কিছু খেলোয়াড় পাওয়া যাচ্ছে। আপনি যদি নিয়মিত লিগ কিংবা জেলা পর্যায়ে খেলা না চালান তাহলে তো খেলাতে স্থবিরতা নেমে আসবে। হকির বেলাতেও তাই হয়েছে। সারাবছর দেশব্যাপী খেলা ছাড়া কোনও বিকল্প নেই। তাহলে বিকেএসপি ছাড়াও আরও ভালোমানের খেলোয়াড় বেরিয়ে আসবে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: বিশ্বকাপে সুযোগ তো মিললো। ২০২৫ ডিসেম্বরে ভারতে ২৪ দল নিয়ে লড়াই। এখন বাংলাদেশ দলের পরিচর্যা কেমন হওয়া উচিত…
শুভ: বুধবার স্থান নির্ধারণী ম্যাচ রয়েছে। এরপর দেশে ফিরতে হবে। আমার কাছে মনে হয় দেরি না করে এই দলটাকে পরিচর্যা করা উচিত। দেশে ও দেশের বাইরে খেলানো উচিত। খেলার মধ্যে থাকলে ডিসেম্বরে বিশ্বকাপে সম্মানজনক ফল হতে পারে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: ওহ ভালো কথা। আগে মালয়েশিয়া ও চীনের বিপক্ষে জেতা কঠিন ছিল। এবার কী ওদের মান কমেছে নাকি আমাদের বেড়েছে? মাস্কটে অন্যরা কী বলছে?
শুভ: আসলে মালয়েশিয়াকে ২০০১ সালে আমরা হারিয়েছিলাম। এবার তো জিততে জিততে ড্র হলো। আমার কাছে মনে হয় ছেলেদের সবার বেশ উন্নতি হয়েছে। অন্য দলের কোচদের ভাষ্যও তাই।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: হকিতে এডহক কমিটি এসেছে। এছাড়া হকিতে গ্রুপিং সবচেয়ে বেশি। দলাদলির কারণে ফেডারেশন চালানো কঠিন। আপনি কি মনে করছেন এই দলটি সারা বছর প্রশিক্ষণের ওপর থাকতে পারবে?
শুভ: আমি আশাবাদী। বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তো সবসময় আসে না। আমার মনে হয় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। তাহলে হকির উন্নয়ন হবে।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: আমরা শেষ দিকে এসে পড়েছি। বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্সে কতটুকু খুশি?
শুভ: আমি সন্তুষ্ট বলতে পারেন। ছেলেরা এতো কম সুযোগ সুবিধা নিয়ে বড় বড় দলের সঙ্গে ড্র। ওমান-থাইল্যান্ডকে হারানো। বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। ডিসেম্বরে ইউরোপ-এশিয়ার বড় দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপে খেলবে। এটা তো আমাদের ক্রীড়াঙ্গনেও বড় খবর।
প্রতিদিনের কণ্ঠ: খেলা শেষ হতে না হতেই কথা বলার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
শুভ: আপনাকেও স্বাগতম।