মেহেদী হাসান, খুলনা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা। খুলনার ছয়টি আসনে এবার মোট ৩৮ জন প্রার্থী নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে নামছেন।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) দুপুরে খুলনা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষ ও জেলা নির্বাচন কার্যালয়ে পৃথক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রার্থীদের হাতে প্রতীক তুলে দেওয়া হয়। খুলনার বিভিন্ন আসনের প্রতীক বরাদ্দ কার্যক্রম পরিচালনা করেন জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ স ম জামশেদ খোন্দকার এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা।
খুলনা-৩ সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ফয়সাল কাদের। প্রতীক বরাদ্দ সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে জেলার ছয়টি আসনেই নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
তবে প্রতীক বরাদ্দের দিনই নির্বাচনকে ঘিরে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে শঙ্কার কথা প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। খুলনা-৫ আসনে প্রার্থী হয়ে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে নামার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, নির্বাচনে কালো টাকা, সন্ত্রাস ও ভয়ভীতি বন্ধ করতে হলে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনকে এখনই কঠোর অবস্থান নিতে হবে। সব প্রার্থী ও ভোটারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগে সমতার অভাবের অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, চোখের চোখটা সমান হওয়া দরকার। আমরা দেখছি, কিছু প্রার্থী প্রকাশ্যে সমাবেশ করছেন, প্রতীক প্রদর্শন করছেন, এমনকি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করছেন। অথচ এসব ঘটনায় কোনো শোকজ বা নিষেধাজ্ঞার খবর নেই।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন কমিশনের সচিবের সঙ্গে আলোচনায় তিনি জানতে পেরেছেন—প্রকাশ্য প্রচারণা শুরুর আগেও বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণসংযোগ করা আইনসম্মত।পরিচয়পত্র সঙ্গে রেখে গণসংযোগ করাকে আইন লঙ্ঘন হিসেবে দেখানো হচ্ছে—এটি দুঃখজনক, মন্তব্য করেন তিনি। এ সময় তিনি সব প্রার্থীর প্রতি সমান নজরদারি ও ন্যায়সংগত আচরণবিধি প্রয়োগের আহ্বান জানান।
এদিকে খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিএনপি প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তিনি বলেন, গত এক বছরে খুলনায় ৫২টি হত্যাকাণ্ড এবং ৫০টির বেশি লাশ উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।
তিনি অবিলম্বে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান জোরদার, চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শক্ত চেকপোস্ট স্থাপন, যৌথ বাহিনীর টহল বৃদ্ধি এবং নগরীর ভেতরে সেনাবাহিনীর ছোট ছোট ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান। তার মতে, নিরাপদ পরিবেশ ছাড়া অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে খুলনা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা আ স ম জামশেদ খোন্দকার বলেন, বিস্তীর্ণ এলাকায় বহু রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীকে মনিটর করা অবশ্যই চ্যালেঞ্জিং। তবে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী আমরা সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করছি।
তিনি আরও বলেন, কোনো পক্ষপাতিত্বের সুযোগ নেই। অসংখ্য গণমাধ্যম, পর্যবেক্ষক ও প্রশাসনিক নজরদারির কারণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। ভবিষ্যতেও নির্বাচন কমিশনের নীতিমালা অনুযায়ী কঠোরভাবে দায়িত্ব পালন করা হবে।
প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রার্থীদের সমর্থকরা নিজ নিজ প্রতীক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন পোস্টার, ব্যানার ও গণসংযোগের প্রস্তুতিতে। আগামীকাল সকাল থেকেই সব প্রার্থী নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরু করবেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে এবারের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল প্রতীক আর প্রার্থীদের সংখ্যার হিসাব নয়; বরং এটি পরিণত হয়েছে নির্বাচনী পরিবেশ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সমান সুযোগ নিশ্চিত করার এক কঠিন পরীক্ষায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই মাঠে নামছে প্রার্থীরা, কিন্তু একই সঙ্গে সামনে এসেছে আইনশৃঙ্খলা, কালো টাকা, আচরণবিধি বাস্তবায়ন ও প্রকাশ্য প্রচারণা ঘিরে নানা প্রশ্ন। ফলে খুলনার এই ছয়টি আসনের নির্বাচন হয়ে উঠেছে শুধু ভোটের লড়াই নয়, বরং গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তাদের মতে, এই নির্বাচনের ফলাফল যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে—ভোটের দিন পরিবেশ কতটা শান্তিপূর্ণ থাকে, প্রশাসন কতটা দৃঢ় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখে এবং সাধারণ ভোটার শেষ পর্যন্ত নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগে কতটা আস্থা পান।










